*** বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (দ্বিতীয় খন্ড) থেকে কিছু আগ্রহপূর্ণ তথ্য তুলে দিলাম ।
আমরা জানি যে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ দর্শনচর্চায় বাঙালি আগ্রহ দেখায়নি । প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির মধ্যে দুটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে -- তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও আবেগ । ষোড়শ শতাব্দীতে বাঙালি মেধার শ্রেষ্ঠ দান হল নব্যন্যায় ও চৈতন্য রেনেশাঁস । এই দুটি ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে একদিকে নব্যন্যায় বুদ্ধির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবেশ করেছে ; আবার অন্যদিকে চৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণব মতাদর্শ আবেগ নির্ভর ।
ষোড়শ শতাব্দীর আগে বঙ্গদেশে কী রকমের দর্শনচর্চা হত ? তার প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া কঠিন । কিন্তু কিছু উপাদান থেকে জানা যায় যে চৈতন্যযুগের আগে এখানে স্মৃতি-মীমাংসার চর্চা ছিল এবং ষড়দর্শনও অনুশীলিত হত । কারণ বঙ্গাক্ষরে লেখা ষড়দর্শনের পুঁথি ও টীকা এখানে অনেক পাওয়া গেছে । মুসলমান আকরমণের পর হিন্দু সমাজের পুনর্গঠনের জন্য চৈতন্যযুগের আগে স্মৃতির চর্চা খুব বেশি হত । স্মৃতির চর্চা করার করার জন্য কিছুটা মীমাংসা জানা দরকার ছিল , তাই বিদ্যার্থীরা সেইটুকুই মীমাংসা চর্চা করতেন । কিন্তু একসময় বঙ্গের বাইরেও গৌড়-মীমাংসকদের খ্যাতি ছিল ।
বেদান্তচর্চা ১৫-১৬ বছর পরেও চলেছে । এরপর বঙ্গদেশে অদ্বৈতবাদের ভক্তিবাদী ব্যাখ্যাই বেশি জনপ্রিয় হতে শুরু করে ।
মধ্যযুগে নব্যন্যায় ছাড়া অন্যকিছু যেমন সাংখ্য বা বৈশেষিক দর্শন খুব বেশি অনুশীলিত হয়েছিল বলে মনে হয় না ।
সবশেষে বঙ্গদেশে ন্যায়চর্চার কথা বলতেই হবে । গৌড়িয় নৈয়ায়িকদের সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি , তার্কিকতা ও বিচক্ষণতা সারা ভারতবর্ষেই শ্রদ্ধা লাভ করেছিল । খ্রীঃ ষোড়শ শতকে নবদ্বীপ নব্যন্যায়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল ।
এর সঙ্গে এই কথা কিন্তু মনে রাখতেই হবে যে বাঙালিরা কিন্তু নব্যন্যায় সৃষ্টি করেননি । বাঙালি পন্ডিতরা এই গ্রন্থের অসংখ্য টীকা রচনা করেন । আসলে এই টীকাগুলিই বেশি প্রচার লাভ করেছিল ।
অনেকে বলেন এটাই বাঙালির স্বভাব । নিজেদের মৌলিক চিন্তা প্রকাশ করতে না চেয়ে তাঁরা পুরোনো গ্রন্থগুলিকেই আবার বিচার করতেন । পূর্বপক্ষের মত খন্ডন করে তাঁরা নিজেদের বুদ্ধি ও পান্ডিত্যের প্রকাশ করতেন ।
স্বর্গীয় মনোমোহন চক্রবর্তী বলেছিলেন -- রঘুনাথ চক্রবর্তী থেকে শুরু করে গদাধর ভট্টাচার্য পর্যন্ত নবদ্বীপে এমন অনেক পন্ডিতের আবির্ভাব হয়েছিল যাঁরা মধ্যযুগের ইয়োরোপিয় দার্শনিকদের পরাজিত করতে পারতেন তাঁদের বিচার-বুদ্ধি ও চিন্তাধারার মাধ্যমে ।
যাইহোক , বলা যায় বাঙালি মণীষার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন সেই সময়েই দেখা গিয়েছিল । সবকিছুর মধ্যে নব্যন্যায় ও চৈতন্যদেবের ভক্তিবাদ বঙ্গের বাইরেও সবকিছুর মধ্যে নব্যন্যায় ও চৈতন্যদেবের ভক্তিবাদ বঙ্গের বাইরেও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছিল । যদিও নব্যন্যায় বাঙালির বিচার-বুদ্ধিকে আরও তীক্ষ্ণ করেছিল কিন্তু অনেকে প্রশ্ন করেন যে এর উপযোগিতা কী ? ১৭৪০ সালে ফাদার পন্স নামে এক জেসুইট বঙ্গদেশে এসে নব্যন্যায় পড়েছিলাম । কিন্তু তিনি লিখেছিলেন --“it stuffed with an endless number of questions, great deal more subtle than useful”. ছাত্রদের সম্পর্কে তিনি বলেন--“the students spend several years in studying a thousand varieties of subtleties on the members of the syllogism, the causes, the negations, the genera, the species etc. They dispute stubbornly on such like trifles and go away without having required any other knowledge”. যাইহোক , দর্শনটির উপযোগিতা নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা না করে বলতে পারি যে বাঙালির মেধা , ধী-শক্তির প্রকাশ এই দর্শনালোচনার মাধ্যমে হয়েছিল ।
***বই -- “বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত” (দ্বিতীয় খন্ড:-- চৈতন্যযুগ)
যখন সময় থমকে দাঁড়ায়
ওরা কাজ করে
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment